ভ্রমন

চলুন যাই বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে

মধুমতি নদীর তীরে অবস্থিত টুঙ্গিপাড়া। আপনি এখানে এলে বাংলার রূপকে স্বচক্ষে দেখতে পারেন। টুঙ্গিপাড়ার গাঁয়ের মেঠো পথের পারে চোখে পড়বে বিল-ঝিল। আর সেখানে ফুটে রয়েছে কত না পদ্ম-শাপলা। টগর-কামিনী ফুলের গন্ধেও উন্মাদ হতে হয় তখন।

টুঙ্গিপাড়ার নামকরণের ইতিহাস

জনশ্রুতি আছে, পারস্য থেকে কয়েকজন মুসলিম সাধক এই এলাকার প্লাবিত অংশে টং বেঁধে বসবাস করতে থাকেন। কালক্রমে ওই টং থেকেই এ এলাকার নামকরণ হয় টুঙ্গিপাড়া।

এই টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি। এখানে ঢুকতেই পাথরের গায়ে লেখা রয়েছে

“দাঁড়াও পথিক বর যথার্থ বাঙালি যদি তুমি হও,

ক্ষণিক দাঁড়িয়ে যাও, এই সমাধিস্থলে

এখানে শুয়ে আছেন, বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা”

সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স গোপালগঞ্জ শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত। জানা যায়, প্রতিদিনই দেশি-বিদেশি প্রায় হাজার হাজার দর্শনার্থী জমায়েত হয় এখানে। টুঙ্গিপাড়াতেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটে শাহাদত বরণ করেন তিনি। পরের দিন টুঙ্গিপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে মা ও বাবার পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

লাল সিরামিক ইট আর সাদা-কালো মার্বেল পাথর দিয়ে নির্মিত এ সৌধের কারুকাজে ফুটে উঠেছে বেদনার চিহ্ন। কমপ্লেক্সের সামনে, দুই পাশের উদ্যান পেরোনোর পরই বঙ্গবন্ধুর সমাধি। পাশে তাঁর বাবা ও মায়ের সমাধি। এই তিন সমাধি নিয়েই গড়ে উঠেছে গোলাকার গম্বুজবিশিষ্ট মূল সমাধিসৌধ। সমাধিসৌধের ওপরের দেয়ালে জাফরি কাটা। সব সময় আলোছায়ার মায়াবী খেলা সেখানে। ওপরে থাকা কারুকাজ করা কাচের ভেতর দিয়েও আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাধিতে। চারদিকে কালো, মাঝখানে সাদা মার্বেল পাথর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধি বাঁধানো।

বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে ঢুকতে কোনো প্রবেশমূল্য দিতে হয় না। সমাধিসৌধের প্রদর্শনী গ্যালারি ঘুরে দেখতে পাবেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি। রয়েছে একটি পাঠাগারও।পাঠাগারে রয়েছে অনেক বই। পাঠাগারের পাশেই দর্শক গ্যালারিসহ একটি উন্মুক্ত মঞ্চ রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা যায়। গ্যালারি থেকে কিছু দূরে বঙ্গবন্ধুর সমাধি। চমৎকার স্থাপত্য দিয়ে সমাধিকে আবৃত করে রাখা হয়েছে। সমাধির কাছে সবার যাওয়ার অনুমতি থাকলেও ছবি তোলা নিষেধ।

প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সমাধিসৌধ খোলা থাকে। পাঠাগার খোলা থাকে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

শুধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স নয়, এর আশপাশের এলাকায় অনেক কিছুই দেখার রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আদি পৈতৃক বাড়ি, ছেলেবেলার খেলার মাঠ, বঙ্গবন্ধুর স্কুল, বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বালিশা আমগাছ, শেখ বাড়ি জামে মসজিদ (স্থাপিত হয়েছে ১৮৫৪ সালে) ইত্যাদি। আছে হিজলতলা ঘাট, যেখানে বঙ্গবন্ধু ছোটবেলায় গোসল করতেন। দেখা মিলবে শেখ পরিবারের ঐতিহ্যবাহী একটি বড় ও একটি ছোট আকারের পুকুর এবং বঙ্গবন্ধু সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের পাশেই টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার উদ্যোগে নির্মাণ করা হয়েছে শেখ রাসেল শিশুপার্ক।

সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স ও বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য নানা স্থাপনা ঘুরেফিরে আসার সময় কবিতার সেই পঙক্তিগুলো মনে হয় বারবার।

“যতদিন রবে পদ্মা যমুনা

গৌরী মেঘনা বহমান,

ততকাল রবে কীর্তি তোমার

শেখ মুজিবুর রহমান…”

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সারাসরি বাসে টুঙ্গিপাড়া যাওয়া যায়। বাসের রয়েছে দুটি রুট। একটি গাবতলী থেকে পাটুরিয়া হয়ে, অপরটি গুলিস্তান থেকে মাওয়া ঘাট পাড় হয়ে। গাবতলী থেকে টুঙ্গিপাড়ার দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার। গোল্ডেন লাইন, সেবা গ্রিন লাইন, কমফোর্ট লাইন নামের বাসে টুঙ্গিপাড়া যেতে সময় লাগে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর বাস পাওয়া যায়। ভাড়া জনপ্রতি ৩৫০ টাকা

গুলিস্তান থেকে টুঙ্গিপাড়ার দূরত্ব ১৬০ কিলোমিটার। এ পথে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, দোলা, ইমাদ ও মধুমতী পরিবহনের বাসে চড়ে টুঙ্গিপাড়া যাওয়া যায়। প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর বাস পাওয়া যাবে। ভাড়া প্রতিজন ৩০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

টুঙ্গিপাড়ার উপজেলা পরিষদের পাশে মধুমতী নামে পর্যটনের একটি মোটেল আছে। এখানে থাকার ব্যবস্থা আছে। রুমের ভাড়া নন-এসি ৭০০ টাকা ও এসি এক হ্জার ৫০০ টাকা। রাতযাপনের জন্য গোপালগঞ্জ শহরেও আছে বেশ কটি আবাসিক হোটেল। রুমের ভাড়া ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকার মধ্যে।

ভি-ডি-ও-দেখুন:

0Shares