মতামত

উন্নয়নের ধারা গতিশীল ও চলমান রাখতে হবে

0Shares

বাংলাদেশের এখন যে অর্থনৈতিক অবস্থা, অর্থনীতির যে গতি-প্রকৃতি আমরা দেখছি, তাতে বেশ কিছু বিষয় আমাদের সামনে চলে আসে। প্রথম কথা হলো, বাংলাদেশ যে ধারাবাহিকভাবে উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে, এটা আমরা সবাই বলছি। এর বাস্তবতা আছে। ভবিষ্যতে উন্নয়নের এই ধারা আরো এগিয়ে নিতে হবে। এটাই এখন আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে আমাদের আরো কতগুলো নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অবকাঠামো বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে এটাও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে যে এই বিশ্বায়নের যুগে অন্যান্য দেশের সঙ্গে উন্নয়নের পথে আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজারে কতটা এগিয়ে যেতে পেরেছি। এটার একটা চ্যালেঞ্জ কিন্তু আমাদের সামনে আছে। এর সঙ্গে আরো কতগুলো বিষয় আছে। যেমন—প্রবৃদ্ধির সুবিধাগুলো সাধারণ মানুষ ঠিকমতো পাচ্ছে কি না। এ বিষয়গুলো আমাদের নতুন করে এবং বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।

সামনে নির্বাচন আসছে। নির্বাচনের আবহ শুরু হয়ে গেছে। সব দলের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পর তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং প্রভাবশালী প্রতিটি দল নির্বাচনে জয়লাভের জন্য একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। এটাই নিয়ম। কিন্তু সরকার যে দল থেকেই নির্বাচিত হোক না, সরকার যিনিই পরিচালনা করুন না কেন, বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কতগুলো বিষয়ে দৃষ্টিপাত করতে হবে এবং গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের যে কাঠামো ও প্রক্রিয়া এখন প্রবহমান আছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়গুলো পরিচালন করতে হবে। রাজনৈতিক নেতারাই তো দেশ পরিচালনায় যুক্ত থাকেন, ফলে তাঁদের ওপর এ বিষয়গুলো অনেক সময় নির্ভর করে।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে আমাদের এই যে উন্নয়নমূলক অর্থনৈতিক অবস্থান, এ পর্যন্ত নিয়ে আসতে আমাদের ৪৭ বছর লেগেছে। এখন আরো সামনে এগিয়ে যেতে হলে আমাদের সিরিয়াসলি কাজ করতে হবে এবং দেশকে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল এবং মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছি, আগামীতে যেন আমরা উচ্চ আয়ের দেশে প্রবেশ করতে পারি। এ জন্য আমাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে, সেগুলো মোকাবেলা করতে হবে।

রাষ্ট্রীয় কাজে আমরা যখন নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিই, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত হয় এবং সে অনুযায়ী তো কাজ হয়ে থাকে। কিন্তু যে কথাটি বলার—কিছু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মসম্পাদনে প্রাতিষ্ঠানিক যে দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো রয়ে গেছে, বিশ্বের কাতারে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে সেই সমস্যাগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দূর করতে হবে। আমাদের কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে—বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, বিইআরসি, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন—এসব প্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও কর্মতৎপর লোকজনকে আনতে হবে এবং সেখানে কাউকে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়ে আসা যাবে না। আমরা এটাকে বলি ম্যাক্রো সামষ্টিক অর্থনীতি। অর্থনীতি পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার জন্য এটা বড় হাতিয়ার। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই এগুলো যদি দুর্বল হয়, তাহলে কোনো নীতি ও পরিকল্পনা কাজে লাগবে না। আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারব না।

এটার সঙ্গে আরো কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপর নজর দেওয়া উচিত। যেমন—সরকারের সেক্টর বা খাত। এগুলোর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। এই দুটি বিভাগে যদি আমরা বিশেষভাবে নজর দিতে না পারি, তাহলে কিন্তু বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারবে না। আমরা বলছি, শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে; কিন্তু এখানে গুণগত মানের ব্যাপার আছে। উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হওয়ার পরও অনেকে কাজ পাচ্ছে না, সেটি নিয়েও ভাবতে হবে। কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো—শিক্ষার মানটা বাড়াতে হবে। কারণ সূচকের দিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলি। কিন্তু আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এটা তো দুই হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকার মধ্যেও নেই। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ভালো করছে, এমনকি সিঙ্গাপুর বা চায়না তো এ বিষয়ে অনেক এগিয়ে আছে। তারা কিন্তু পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। আমরা সেই কাতারে নেই এবং অনেক পিছিয়ে আছি। তার মানে এই নয় যে সব মনোযোগ এখানে দিতে হবে। আমাদের দেশের অনেক সেক্টরে উন্নয়ন হচ্ছে সত্য, কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মনোযোগটা বাড়াতে হবে। আমাদের যে প্রাথমিক বা স্কুল পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সেগুলোর ম্যানেজমেন্ট তো আগের চেয়ে খারাপ হয়ে গেছে। অর্থের বরাদ্দ কিন্তু বেড়েছে, সে তুলনায় ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হয়নি। আর সরকারি হাসপাতালগুলোতে তো অবকাঠামো বেড়েছে, সেবার মানটা বাড়েনি। এখন তো বেসরকারি খাতে চলে গেছে স্বাস্থ্যের সেবাগুলো। ফলে মানুষ বেসরকারি হাসপাতালে নির্ভর হয়ে পড়েছে। সেখানেও বিড়ম্বনা। কারণ কোনো মানুষের যদি চিকিৎসার জন্য এক শ টাকা ব্যয় হয়, সেখানে কমপক্ষে ৬০ টাকা খরচ রোগীর পকেট থেকে দিতে হয়। চিকিৎসা তাই খুব ব্যয়সাপেক্ষ এবং সবার জন্য এত অর্থ ব্যয় করা সম্ভবও নয়। এই জিনিসগুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে আমি মনে করি।

এখন সময় এসেছে, এই খাতগুলোতে বিশেষভাবে নজর দিয়ে ভালোভাবে কাজ করা। এর পরে যে বিষয়গুলো সামনে আসে—প্রাইভেট খাতে বিনিয়োগের বিষয়টি। সরকারি অনেক মেগা প্রজেক্ট আছে; কিন্তু বিনিয়োগের জন্য নানা ধরনের নিয়ম ও আইন আছে। সেগুলো সামনে রাখতে হবে। আমরা বলি—বিনিয়োগ আবহ বা পরিবেশ; যতই কথাবার্তা বলা হোক না কেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ কিন্তু সেভাবে উন্নত হয়নি। এই খাতে উন্নয়ন না করলে ভবিষ্যতে ফলটা ভালো হবে না। এসব ক্ষেত্রে নিয়ম ও রেগুলেটরের গুরুত্বও কম নয়। পলিসির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। এর পরে আছে ট্যাক্স, জমি নিবন্ধন এবং বিভিন্ন কাজের বিষয়ে অনুমতি পাওয়া—এগুলো দ্রুত করতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরের সুবিধাগুলো যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং স্টক এক্সচেঞ্জের সুবিধা যেন অল্প সময়ে পাওয়া যায়, এ ব্যবস্থাগুলো নিতে হবে। আমরা শুধু বলেই যাচ্ছি, কিন্তু কাজ খুব একটা এগোয়নি।

ডুয়িং বিজনেসের সূচকগুলো যেগুলো বিশ্বব্যাংক হিসাব করেছে, বাংলাদেশ কিন্তু সেখানে ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ ধাপ নিচে নেমে এসেছে। এটা কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। এমন তো হতেই পারে না। আমরা যেখানে প্রবৃদ্ধি করছি, উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, সেখানে ডুয়িং বিজনেসে নেমে যাওয়াটা তো মেনে নেওয়া যায় না। এর মূল কারণ হচ্ছে, যাঁরা ব্যবসা করছেন তাঁরা সময়মতো অনুমতি পাচ্ছেন না। বহুদিন তাঁরা বিভিন্নভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস, রাস্তাঘাট এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ ও আনুষঙ্গিক বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছে না। জমি নিবন্ধনে ধীরগতি এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে কাজের যে চুক্তিগুলো হচ্ছে, সেগুলোর প্রয়োগের ব্যাপারে অত্যন্ত ধীরগতি। আর একটি বিষয় আছে, আইনি প্রক্রিয়া। আইনগত প্রক্রিয়া প্রচুর জটিল ও বিলম্বিত। এখানে দেউলিয়া আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই। এগুলো আমাদের পিছিয়ে দেয়। আফগানিস্তানের মতো দেশ আমাদের থেকে ওপরে চলে গেছে, এটা তো অবাক করার মতো খবর। আমরা হয়তো চ্যালেঞ্জ করতে পারি, তারা কিভাবে এগিয়ে গেল বা বাংলাদেশ এত পিছিয়ে কেন বা সূচক কিভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে? কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে, আফগানিস্তান তাদের কয়েকটি কাজে মৌলিক কিছু পরিবর্তন এনেছে। আমাদের এখানে যে সমস্যাগুলো সামনে দেখতে পাচ্ছি, তারা ইদানীং কয়েকটা সমাধান করেছে। ফলে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে ব্যবসা আবহ বা পরিবেশের সূচকগুলোর ক্ষেত্রে। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। সার্বিকভাবে তারা হয়তো আমাদের চেয়ে এগিয়ে নেই। তবে কয়েকটি বিষয়ে তারা আমাদের থেকে এগিয়ে আছে। আমরা যদি এ বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না করি, যে দুর্বলতাগুলো আছে দীর্ঘদিন ধরে, সেগুলো দূর না করলে কিন্তু আমরা অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে যাব, দ্রুত এগিয়ে যেতে পারব না।

আমরা স্বাধীনতার পরে অনেকগুলো বছর পার করে এসেছি। এখন আমাদের মানবসম্পদে জোর দিতে হবে। মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটাতে পারলে দেশ এগিয়ে যাবে। আমাদের যে অনেক দূরে যাওয়ার স্বপ্ন, উন্নয়নের একটি চূড়ায় পৌঁছে যেতে চাই, সেসব বাস্তবায়ন করতে হলে ওপরে উল্লিখিত বিষয়গুলোর ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের যে ধারা চলছে, সেগুলোর সঙ্গে আর যে বিষয়গুলোতে সমস্যা আছে, সেসবও মাথায় রাখতে হবে। তাহলে আমাদের উন্নয়নের যাত্রা দ্রুত হবে ও লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

0Shares