মতামত

সুবিধাবাদী নীতিহীন কলিমুদ্দিন

এখনকার জমানায় সবচেয়ে লাভজনক পেশা হচ্ছে রাজনীতি। এ মুহূর্তে এর চেয়ে লাভজনক আর কোনো পেশা নেই। একসময় রাজনীতি ছিল সেবামূলক পেশা। রাজনীতিবিদদের প্রধান উদ্দেশ্যই ছিল দেশ এবং দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা। এখন রাজনীতিতে নামার প্রধান উদ্দেশ্য নিজের আখের গোছানো। আর কোনোমতে একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে সাতজন্মেও আর কাউকে কিছু করতে হবে না।

এলাকার উন্নয়নকাজের নামে আজকাল পুকুর চুরি, নদী চুরি, এমনকি সমুদ্রও চুরি হয়ে যায়! কী আজব দেশ রে বাবা! এমপিদের হাতে স্রোতের মতো টাকা আসতে থাকে। সেই টাকায় দেশে-বিদেশে গড়ে ওঠে স্বপ্নের অট্টালিকা। ক্ষমতার পালাবদলেও কেউ যাতে টিকিটিও ছুঁতে না পারে, সে পথও খোলা রাখেন তাঁরা।

গেলবার যাঁরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরা তো বিনা পুঁজিতে মাশাআল্লাহ বিশাল বাণিজ্য করেছেন। কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হয়েছেন। সেই টাকা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও পাড়ি দিয়েছে। কেউ ফ্ল্যাট কিনেছেন। আবার কেউ বিদেশের ব্যাংকে জমিয়েছেন। এবারও টাকা কামানোর সনদ পাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নাচতে নাচতে এলাকায় গিয়েছেন! আর অমনি তোপের মুখে পড়েছেন তাঁরা।

অনেকে অবশ্য আগে থেকেই এলাকাছাড়া। কেউ কেউ স্থানীয় নেতাকর্মীদের হাতে প্রহৃত হয়েছেন। অনেকে জান নিয়ে পালিয়েছেন। এর কারণ হচ্ছে, তাঁরা দলের বাইরে একটি নিজস্ব বিকল্প বলয় গড়ে তুলেছিলেন। তাই বিক্ষুব্ধ হয়েছে দলের নেতাকর্মীরা। এবার তাঁরা টের পাচ্ছেন কত ধানে কত চাল!

তার পরও এমপি হওয়ার মজাই আলাদা! সেই মজা কলিমুদ্দিনরা ছাড়া কেউ বুঝত না। তিনি একবার তাঁর বন্ধুদের কাছে রসিয়ে রসিয়ে বলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করছি। তাঁর আমলে এমপি হইছিলাম। সেই ভাবমূর্তিই আমার বড় পুঁজি। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আমি খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে হাত মেলালাম। ব্যস, সব বিপদ গেল কেটে। আমাকে আর কে ঘাঁটায়? তারপর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করলেন। আমিও ভিড়ে গেলাম তাঁর সঙ্গে। মন্ত্রীর পদও পেয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবি, কী ভাগ্য নিয়া দুনিয়াতে আসছি! এ রকম ভাগ্যবান কয়জন আছে দেশে!

জিয়াউর রহমানের পুরো আমলেই তিনি দাপটের সঙ্গে মন্ত্রিত্ব করেছেন। শুরুর দিকে অনেকে বিভিন্ন কারণে বাদ পড়লেও কলিমুদ্দিন থেকে যান বহাল তবিয়তে। ওপরে ওপরে সততার ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে ভালোই অর্থকড়ি রোজগার করেন। তিনি বিপদে পড়ার আগেই জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপর বিচারপতি সাত্তার ক্ষমতাসীন হন। এ সময় কলিমুদ্দিন গাঢাকা দিয়ে থাকেন। তিনি জানতেন, ক্ষমতার নাটাই সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের হাতে। সাত্তার সরকারে যোগ দিলে এরশাদের কাছে ভেড়া যাবে না। তিনি ভেতরে ভেতরে এরশাদের সঙ্গে লাইন লাগালেন। এরশাদেরও তখন এ রকম সুবিধাবাদী নেতাদেরই দরকার ছিল। তিনি কলিমুদ্দিনের টোপ গিললেন।

ক্ষমতা দখল করেই জেনারেল এরশাদ সুবিধাবাদীদের কাছে ডাকলেন। সেই দলে কলিমুদ্দিনরাও ঢুকে গেলেন। বাগালেন মন্ত্রীর পদ। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তাঁর হাতে বিপুল পরিমাণ টাকা আসে। তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হন।

এরশাদের পতনের পর কলিমুদ্দিন আবার গাঢাকা দিলেন। কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেল না। এরই মধ্যে এলো নির্বাচন। নির্বাচনের ডামাডোলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল। আর সেই সুযোগে স্বৈরাচারী সরকারের দোসরদের অনেকেই আওয়ামী লীগ-বিএনপিতে ভিড়ে গেলেন।

কলিমুদ্দিন দীর্ঘদিনের রাজনীতি করা মানুষ। তিনি রাজনীতির হাওয়া ভালো বোঝেন। তিনি দেখলেন, বিএনপিতে যোগ দেওয়া অতি সহজ। নির্বাচনের টিকিটও পাওয়া যাবে অতি সহজে। ব্যস, তিনি সুযোগমতো ঢুকে গেলেন বিএনপিতে। আস্তে আস্তে বিএনপিতে জায়গা করে নিলেন। ভোটের জোয়ারে নির্বাচনী বৈতরণীও পার হলেন। দিন দিন স্বৈরাচারের গন্ধ মুছে তিনি গণতন্ত্রের লেবাসধারী হয়ে উঠলেন। সভা-সেমিনারে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দেন। এমন ভাব করেন যেন তাঁর মতো গণতন্ত্রী দেশে দ্বিতীয় কেউ নেই।

মাগুরার উপনির্বাচনে কারচুপি করতে গিয়ে বিএনপির ভিত নড়ে গেল। যেন পচা শামুকে পা কাটার দশা হলো! চতুর রাজনীতিবিদ কলিমুদ্দিন বুঝলেন, বিএনপির দিন শেষ। তিনি দেখলেন, পিঠ বাঁচাতে হলে আওয়ামী লীগেই ভিড়তে হবে। হঠাৎ তিনি ভোল পাল্টে ফেললেন। এখন তিনি কথায় কথায় বঙ্গবন্ধু বলেন। প্রাসঙ্গিক না হলেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তিনি রাজনীতি করেছেন, সেই উদাহরণ টানেন। মাঝেমধ্যে মুজিব কোটও পরেন। তারপর একদিন আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিলেন। এর পরই এলো নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটও পেলেন তিনি।

নির্বাচনে কলিমুদ্দিন বিজয়ী হলেন। এমপি হয়ে তিনি আবার আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি এখন আর মন্ত্রী হওয়ার ধান্দা করেন না। তিনি হিসাব কষে দেখেছেন, এখন মন্ত্রী হওয়ার চেয়ে এমপি হওয়া বেশি লাভজনক। মন্ত্রী হলে সবার নজর থাকে। এমপিরা হাজার কোটি টাকা বানালেও কেউ ফিরে তাকায় না। চুপচাপ তিনি টাকা কামানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

কলিমুদ্দিন এখন বয়োবৃদ্ধ। তিনি বুঝে গেছেন আওয়ামী লীগের কাছ থেকে তাঁর আর পাওয়ার কিছু নেই। তিনি এবার নিজেই দল গঠন করলেন। ছোটখাটো কয়েকটি দল (যারা স্যুটকেস পার্টি হিসেবে পরিচিত) নিয়ে জোট করলেন। তিনি জানেন, তাঁর জোটের ভোট নেই। তাই অন্য জোটে ঢুকতে হবে। কোথায় ঢোকা যায়?

কলিমুদ্দিন এবার বলা শুরু করলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। তিনি অনেক চিন্তা-ভাবনা করে বিএনপি-জামায়াত জোটে ঢুকলেন। এখন তিনি ধানের শীষ মার্কা নিয়ে ভোট করবেন। তাঁর এই পল্টি খাওয়া দেখে মানুষ বলে, হায় রে রাজনীতি! কলিমুদ্দিনদের এই নীতিহীন রাজনীতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে!

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ভি-ডি-ও-দেখুন:

0Shares