মতামত

ঘরজামাইয়ের পরিণতি হয় ভয়ংকর

একাদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে মেরুকরণ দেখছি, তাকে কোনোভাবেই শুভ লক্ষণ বলতে পারছি না। মনে হচ্ছে, তেলে-জলে মিলেমিশে একেবারে রসায়নের নতুন যৌগ তৈরি হতে চলেছে। অবাক দৃষ্টিতে দেখছি আর ভাবছি এটাও কি সম্ভব! মানুষের পদস্খলনের একটা সীমা থাকে। কিন্তু ড. কামাল হোসেনসহ রাজনীতির কিছু পরিচিত মুখ আজ মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য ঐক্যফ্রন্টের নামে একটা ধূম্রজাল তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী জামায়াত-বিএনপি জোটের সঙ্গে যেভাবে বিলীন হয়ে গেলেন, তা বিগত দিনের সব কলঙ্কের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। হায় রে! আমার সোনার দেশ, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আর কত দিন চলবে। আর কত ষড়যন্ত্র হবে দেশটাকে নিয়ে, যে দেশ পাওয়ার জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে।

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগী হিসেবে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ফসল বাহাত্তরের সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শসংবলিত সব কিছুকে বাতিল করে দেওয়া এবং নিষিদ্ধ জামায়াতসহ পাকিস্তানপন্থীদের রাজনীতিতে পুনরুত্থানের যে সুযোগ করে দেন, তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি মোটা দাগে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম পক্ষের রাজনীতির অবলম্বন হয় দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাহাত্তরের মূল সংবিধান—যার মৌলিক কথা বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা। এই প্রথম পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ, গত প্রায় ৩৭ বছর ধরে যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। দ্বিতীয় পক্ষের আদর্শগত অবস্থান প্রথম পক্ষের সম্পূর্ণ বিপরীত। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি হয় দ্বিতীয় পক্ষের মূল অবলম্বন, যার সঙ্গে পাকিস্তানি মতাদর্শের কোনো পার্থক্য নেই। এই পক্ষের মূল উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশ নামের খোলসে এখানে আরেকটি পাকিস্তান মতাদর্শের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এই দ্বিতীয় পক্ষের নেতৃত্বের সামনে রয়েছে বিএনপি এবং এদের পেছনের শক্তি হচ্ছে জামায়াত। বাংলাদেশে জামায়াত তাদের সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের নির্দেশ ও পরামর্শক্রমে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় এমন একটি কাজও বিএনপি এ পর্যন্ত করেনি, বরং মুক্তিযুদ্ধের সব কিছুকে বিকৃত, বিতর্কিত এবং নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে সেগুলোকে আড়াল করেছে। এই কাজের জন্য তারা জিয়াউর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় এবং বীর-উত্তম খেতাবকে ধূম্রজাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিতে এত বড় বিভাজন বিশ্বের কোনো দেশে নেই। এভাবে একটা দেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে পারে না। এর পরিণতিতে সংঘাত, সংঘর্ষ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা রাজনীতিকে কলুষিত করে রেখেছে এবং এ কারণেই আমরা একটা সুস্থ রাজনৈতিক ধারা পাচ্ছি না। দ্বিতীয় পক্ষ জামায়াত-বিএনপি যে মতাদর্শের রাজনীতি প্রকৃতপক্ষে ও বাস্তবে করছে, সে কথা তারা দ্বিধাহীনচিত্তে স্পষ্ট করে জনগণের সামনে বলে না, সম্পূর্ণ মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কাজ করেও মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে। এতেই প্রমাণ হয় তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, এটা তারা নিজেরাও বোঝে এবং সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধের মুখোশ লাগিয়ে সরলপ্রাণ মানুষকে ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এত দিনে তাদের ধোঁকাবাজির মুখোশ ক্রমেই মানুষের কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ও চেতনার সহজাত শক্তির বলে এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের গুণে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিএনপি মহাসংকটে পড়েছে। তাদের এই সংকটটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, যখন তারা বলতে ব্যর্থ হয়েছে যদি তারা নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে কে হবেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। দেশ পরিচালনায় সবচেয়ে ভাইটাল ফ্যাক্টর প্রধানমন্ত্রী কে হবেন তা উহ্য রেখেই তাদের নির্বাচনে যেতে হচ্ছে। ড. কামাল হোসেন একবার খায়েশ ব্যক্ত করে এখন পিছু হটেছেন। তাহলে কি তারেক রহমান নাকি খালেদা জিয়া—এ কথা বিএনপি লজ্জায় মুখ ফুটে বলতে পারছে না। সুতরাং মানুষ তো বুঝতে পারছে না, যদি তাঁরা বিজয়ী হন, তাহলে দেশের নেতৃত্ব কে দেবেন। দেশ পরিচালনায় ভালো-মন্দের হিসাব-নিকাশে প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন শেষ ভরসা। সেটাই যখন অস্পষ্ট তখন জামায়াত-বিএনপির ২০ দলীয় জোট এবং তার সঙ্গে সবে যোগ দেওয়া ঐক্যফ্রন্টকে মানুষ ভোট দেবে কিসের বিবেচনায়?

২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় ছিল এবং তার নেতৃত্বে ছিলেন খালেদা জিয়া আর বেনামে ছিলেন তারেক রহমান। মানুষের মনে সে সময়ের ভয়ংকর চিত্র এখনো জ্বলজ্বল করছে। ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যার নেতৃত্বে আছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই সময়ে রাজনীতিসহ অর্থনীতি এবং উন্নয়নের যে অগ্রগতি সেটি বাংলাদেশের মানুষ যেমন দেখছে, তেমনি তার স্বীকৃতি এখন বিশ্বব্যাপী। এই ধারা আগামী দিনে অব্যাহত থাকলে স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পথ ধরেই মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবিরোধী রাজনীতি বাংলাদেশে আর টিকবে না। সেটা হবে বাংলাদেশের জন্য বিশাল অর্জন। পাহাড়সম পাথরের চাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হবে। তখন রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ও সমীকরণ হবে। তাতে আওয়ামী লীগের বিপক্ষে শক্তিশালী আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হবে। তখন ক্ষমতায় যারাই থাকুক, বিরোধী পক্ষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা, এমনকি দ্বন্দ্বও থাকবে; কিন্তু ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আর ঘটবে না, ২০০১-২০০৬ মেয়াদের (জামায়াত-বিএনপি সরকার) মতো জঙ্গিবাদের উত্থান হবে না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবে না এবং বাংলাদেশ পরিপূর্ণভাবে ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি থেকে মুক্ত হবে। কিন্তু এই পথে ঐক্যফ্রন্টের নামে একটা ছদ্মবেশ ধারণ করে নিজেদের অরিজিন বা বংশপরিচয়কে ছুড়ে ফেলে, নিজের স্বকীয়তা, আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদাকে বিসর্জন দিয়ে যাঁরা বিএনপির ধানের শীষে বিলীন হয়ে গেলেন, তাঁদের সম্পর্কে মানুষ যা ভাবছে, সেটি এবার নির্বাচনী মাঠে সবচেয়ে মুখরোচক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আত্মপরিচয় বিসর্জনকারী ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, মান্না, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী এবং তাঁদের সঙ্গে বাকি যাঁরা আছেন তাঁদের নিজ যোগ্যতার জন্যই তাঁদের মানুষ ভালো করে চেনে-জানে। তাই মানুষ এসব রাজনৈতিক নেতার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। কিন্তু মানি লোকের মান বিনষ্ট হোক, তা কোনো ভদ্রলোকের কাম্য হতে পারে না। জামায়াত-বিএনপি যদি ক্ষমতায় যায়, তাহলে তাদের সঙ্গে থাকা কেউ নিজস্ব স্বকীয়তা জাগ্রত করতে চাইলে তাঁর বা তাঁদের দশা কী হয়, সেটি প্রত্যক্ষ করা গেছে ২০০১-২০০৬ মেয়াদে। সুতরাং ড. কামাল হোসেনসহ যাঁরা আজ নিজ নিজ অরিজিন বা পিতৃপরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে ধানের শীষের পরিচয়কে গলায়-বুকে বেঁধে নিলেন তাঁরা যদি ভবিষ্যতে কখনো নিজের সম্মানবোধকে জাগ্রত করতে চান, তাহলে পরিণতি কী হতে পারে তা অনুমান করা মোটেই কঠিন নয়।

নির্বাচনে যদি বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট জয়ী হয়, তাহলে সব বিচার-বিশ্লেষণ ও পরিসংখ্যান প্রমাণ দেয় তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সব ক্ষমতা থাকবে জামায়াত-বিএনপির হাতে। তখন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের অবস্থা কী হতে পারে তা আর উল্লেখ করতে চাই না। তবে ছোটবেলায় চাঞ্চল্যকর এক ঘটনাসংবলিত একটা পুঁথি পড়েছিলাম। তার থেকে স্মৃতিতে ওই পুঁথির শেষাংশের যতটুকু মনে পড়ে তার কিছুটা উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করছি। গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের এক ছেলে লেখাপড়া ভালোভাবে শেষ করে মাশাআল্লাহ ভালো একটা চাকরি পায়। তাতে গ্রামের বড় ধনী মাতবরের নজর পড়ে ছেলেটির দিকে। ধনী মাতবর টাকা-পয়সা ও দৌলতের লোভ দেখিয়ে নিজের লেখাপড়া না জানা সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য ওই ছেলের মা-বাবাকে রাজি করান। ঘরজামাই থাকতে হবে এই শর্তে ধনীর দুলালের সঙ্গে ওই ছেলের বিয়ে হয়ে যায়। ছেলে তখন ধন আর ধনীর দুলালির কুহকতায় ঘরজামাইয়ের প্রস্তাব আনন্দ মনে মেনে নেয়। ধনীর মেয়ে একসময় এসে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। সংগত কারণেই ছেলে তার প্রতিবাদ করায় গণ্ডগোল বেধে যায়। মেয়ে তার নিজের মা-বাবা ও ভাইয়ের কাছে ছেলের বিরুদ্ধে মিথ্যা সব অভিযোগ তুলে ধরে। তাতে মেয়ের পরিবারের সবাই ছেলের বিরুদ্ধে চলে যায়। একসময় সবাই মিলে গোপনে ছেলেকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু ভাগ্যিস, ছেলেটি সময় থাকতে তা টের পেয়ে যাওয়ায় শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে এসে জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়। সুতরাং অরিজিন বা পিতৃপরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে অন্যের পরিচয় ধারণ করে যাঁরা বড় বড় কথা বলেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ কখনো ভালো হয় না।

লেখক : রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

sikder52@gmail.com

ভি-ডি-ও-দেখুন:

1Shares